
-চল, একটা গল্প শোনা যাক।
-ঠিক আছে।
-আগে তুই বল।
-না, তুই বল।
-না, তুই।
-আরে, এ যে উত্তম-সুচিত্রা হয়ে যাচ্ছে।
-হয়তো হতেও পারতো, মলিন শোনালো ওর গলা। তারপরে মুখ নামিয়ে বলল, -আচ্ছা, আমরা একসাথে থাকলে কি শুধুই ঝগড়া করতাম?
-হয়তো…অনিশ্চয়তার সঙ্গে আমি বললাম, -জানি না। তবে একসঙ্গে থাকলে ঠোকাঠুকি হবেই।
(*)
-আচ্ছা জাটিঙ্গা বার্ডস-এর নাম শুনেছিস?
-ওদের ব্যাপারটা অদ্ভুত, তাই না?
-হ্যাঁ, ওরা দলে দলে জাটিঙ্গা পাহাড়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে বলে লোকে বলে।
-তুই কী বলিস?
-আত্মহত্যা নয়। আসলে পাখি বা পতঙ্গ, এরা বিশেষ করে রাতে চাঁদের আলো দেখে পথ নির্ণয় করে থাকে। এইসময়ে কৃত্রিম কোন আলোর উপস্থিতিতে ওদের দিক ভুল হয়ে যায়। ফলে আমরা দেখি যে মোমবাতির শিখা বা স্ট্রীট লাইটের চারিদিকে পোকারা ভিড় করে। আসলে কৃত্রিম আলোতে ওদের পথ গুলিয়ে যায়। আর একাধিক আলোক উৎস থাকলে তো হয়েই গেল। হয়তো জাটিঙ্গা পাহাড়ের ভৌগোলিক অবস্থান ও গঠনের কারণে সেখানে বিশেষ ধরনের তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশের সৃষ্টি হয়। ফলে পাখিরা রাতে বাসার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। ওদিকে বিশেষত কৃষ্ণপক্ষের রাতে তারা কোনদিকে যাচ্ছে, সেটা দেখতেও পায় না। আবার পাহাড়ের গড়নের কারণে সেখানে বায়ুস্রোত প্রায়শই খুব তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে পাখিদের দিক ভুল হয়ে গিয়ে বায়ুস্রোতের কবলে পড়ে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ইন্টারন্যাল হ্যামারেজ হয়ে মারা যায়। মোটেও আত্মহত্যা নয়।
-তাই হয়তো……।
-আর এমনই হয়েছিল কোন একটি পাখির অবস্থা।
-তাই?
-হ্যাঁ! সেও একদিন বাসার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। অবশ্য সদ্য সদ্য ডানা গজাচ্ছিল। তার বাবা-মা বুঝেছিল যে এবারে সে আকাশে ডানা মেলে দেবে। তারা ওকে আগাম বিপদ সম্পর্কে কিছুটা আভাস দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু যৌবনের ঔজ্জ্বল্যে সে তখন টগবগ করে ফুটছে। বিপদেরা মুখ লুকোল। লুকিয়ে পড়ল, কিন্তু বিপদ কেটে গেল না।
-তারপরে?
-সে ডানা মেলে দিল। ময়ূরের মতন পেখম মেলল। কত না কসরত করে চলল। সেখানে জুটে গেল আরো অনেক পাখি। সবাই মিলে তারা সেই আগুনের শিখার চারিদিকে নেচে চলল। আর একে একে টুপ-টুপ করে তারা খসার মতন তারা খসে পড়তে থাকল যথাসময়ে।
-মারা গেল পাখিটা?
-নাহ! তাহলে তো গল্প শেষ হয়েই যেত। হঠাৎ সেদিন রাতে চাঁদ উঠল। এমন তার স্নিগ্ধ অথচ গাঢ় ঔজ্জ্বল্য যে নিকটের আগুনের শিখাও ম্লান হয়ে গেল। পাখিটি তার দিক ঠিক করে নিল। ততদিনে অবশ্য তার যৌবন প্রায় অতিক্রান্ত। তারপরে শ্রান্ত শরীরে সে উড়ে চলল নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। একটু বিশ্রামের বড়ই দরকার। পথে আর কোনও আলোকবর্তিকা তাকে বিহ্বল করে নি। সে তার পথ ঠিক চিনে নিয়েছিল। তবে দেরী হয়ে গিয়েছিল অনেক।
(*)
-গল্পটা একটি ফুলকে নিয়ে।
-পাখি, ফুল- এসব নিয়ে কবিতা হয়, গল্প নয়।
-কিন্তু তুই তো একটা গল্পই বললি।
-তাও তো বটে।
-তা সেই ফুলটি ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। অরণ্যে তার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। তার মধু খাওয়ার লোভে কত না ভ্রমর, মধুমক্ষিকা এসে জুটল চারিদিকে। তারা ফুলকে প্রশংসায় ভরিয়ে তুলল। তার চারিধারে ঘুরঘুর করতে থাকল। ফুলটি ভুলে গেল তার স্থান। সে শুধুই স্তুতি-স্তাবকতায় মেতে উঠল। হঠাৎ একদিন দেখা গেল ফুলটি হারিয়েছে তার সুঘ্রাণ। আর মধু আহরণ করে মধুমক্ষিকারা চলে গেছে নিজ পথে। শূন্য সে দিগন্ত।
-তারপরে?
-ফুল তো আর পাখি বা পতঙ্গ নয় যে ছুটে চলে যাবে নতুনের সন্ধানে। সে তখন রিক্ত, লাঞ্ছিত। পদে পদে অসম্মান, অপমান তার নিত্যসঙ্গী। এই নিয়েই আরো বেশ কিছুদিন বাঁচতে হবে ঝরে যাওয়ার আগে অবধি। এরপর থেকে ফুলটি সবসময় মুখ নিচু করেই থাকত। তারপর একদিন………।
(*)
-আচ্ছা, এদের মধ্যে বোকা কে? স্বর্গের দূত আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
-পাখিটি!, আমি বললাম, -কত কিছুই না করার ছিল। যতক্ষণে সে বুঝতে পারল, তার যৌবন অতিক্রান্ত।
-আমার মনে হয় ফুলটি।
-কিভাবে? স্বর্গের দূত হাস্যোজ্জ্বল মুখে ওর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন।
-ফুলটি কিন্তু তার যৌবনের পরিপূর্ণ স্বাদ পেয়েছিল। আমি তড়িঘড়ি বললাম, -পাখিটি বাকিদের ভিড়ে হারিয়েই ছিল।
-আমাকে বলতে দে! গম্ভীর মুখে সে বলল, -ফুলটি প্রথমদিকে সাফল্যের স্বর্গীয় স্বাদ পেয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে সাফল্য তাকে ছেড়ে চলে গেল- যদি অবশ্য সেটাকে আমরা সাফল্য বলে মনে করি। কিছুদিন পরে দেখা গেল যে কেউ তার পানে ফিরেও তাকাচ্ছে না, সবাই তাকে অবহেলা করছে। সেই রিক্ততা, তিক্ততার সম্মুখীন পাখিটিকে অন্তত হতে হয়নি।
-নাহ! আমি মানছি না।
-তোমরা তাহলে কিছুক্ষণ ঝগড়া কর। স্বর্গের দূত বললেন, -আমি একটু ঘুরে আসি।
-আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ! সে বলল, -আমাদের এই ঝগড়া করার সুন্দর সুযোগ উপহার দেওয়ার জন্যে।
-কিন্তু আমরা আর কতক্ষণ এই সুযোগ পাব? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
-বেশিক্ষণ নয়। উনি উত্তর দিলেন। আমি সন্ধ্যাবাতি জ্বালিয়েই ফিরে আসছি। কয়েক মুহূর্ত মাত্র সময় পাবে তোমরা।
ওঁর মহানুভবতা আমাদের অন্তর ছুঁয়ে গেল। কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে পড়লাম। আর পরক্ষণেই তিনি ফিরে এলেন। এসেই আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, -এবারে তোমাদের নিজ নিজ স্থানে ফিরতে হবে। বলে আমাদের পুতুল স্প্রিং-এ ভালো করে দম দিয়ে দুটি আলাদা বাক্সে ছেড়ে দিলেন।
**************
utoldhara.com সপরিবার বাঙলির মনের ঠিকানা