
কালিম্পং শহর থেকে ও দুপুরের মধ্যেই রওনা দিতে পেরেছিল। ঠিকমতন চললে সন্ধ্যার মধ্যেই তিস্তাবাজারের রাস্তায় কালিঝোরা পেরিয়ে সেবকে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঠিকমতন যেতে পারলে তবেই তো। আটমাইলে যেতে না যেতেই শুনতে পেল যে শ্বেতীঝোরার কাছে পাহাড়ের উপর থেকে পাথরের চাঁই পড়ছে। ফলে বেশ কিছুক্ষণ গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে এন এইচ-১০ এ এখন বিশাল যানজট। গাড়ি ঘুরিয়ে রেলীখোলা দিয়ে নেমে সামালবং-সামথার-পানবু হয়ে তিস্তা পেরিয়ে কালীঝোরার পথে সেবকে চলে যাবে বলে ও ঠিক করল। কিন্তু পানবু থেকে তিস্তার দিকে নামতে নামতে ও পথ হারিয়ে ফেলল। সন্ধ্যাও হয়ে এসেছে। এই রাস্তায় কোন মোবাইল নেটওয়ার্ক-ও কাজ করে না। ফলে অনলাইনে ম্যাপ দেখতে পারছে না। অন্তত নিজের অবস্থান বুঝতে পারছে না। এদিকের রাস্তা এখনও পাকা হয়নি। ঘন জঙ্গল চিরে মাটি-পাথরের রাস্তা নেমে গেছে তিস্তার বুকে। ধারে কাছে কোন জনবসতি নেই। পড়ন্ত বিকেলে রাস্তায় একটা লোক অবধি নেই। সন্ধ্যা আসন্ন। আঁধার নামছে দ্রুতলয়ে। নিস্তব্ধ, নিবিড়, প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারের হাতছানি এই রাস্তার পদে পদে। ব্রিটিশ সময়ের সেকেলে গ্রামীণ কালিম্পং-এর একটা স্বাদ পাওয়া যায় এই রাস্তায় এলে।
ঠিক এইসময়ে গাড়ির আলোয় ওর চোখে পড়ল রাস্তার উপরে একজন দাঁড়িয়ে আছে। সে হাত দেখিয়ে ওকে থামতে বলছে। গাড়ি থামিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে ও জিজ্ঞেস করল,
-আমাকে কিছু বলছেন?
-চিনতে পারছেন?
অন্ধকারে ভালো করে দেখার কথা নয়। তবে গাড়ির আলোগুলি সব জ্বালিয়ে দিয়েছিল ও। হালকা আলোয় লোকটিকে দেখে মনে হল, ও তাকে আগে কোথাও দেখেছে। ওর খুব পরিচিত, যদিও ওর এখন মনে পড়ছে না।
-চলুন, গাড়িতে যেতে যেতে কথা বলি। বলে ওকে ভাবার সময় না দিয়ে সামনে দিয়ে ঘুরে এসে বাঁদিকে ওর পাশের সীটে বসে পড়ল লোকটি। হাব-ভাব ওর খুব পরিচিত কিন্তু মনে করতে পারছে না।
-আরেকটা রাস্তা আমি চিনি। লোকটি বেশ কর্তৃত্বের সুরে বলল, -সামনেই একটা তেপথী দেখতে পাবেন। বাঁদিকের রাস্তা ধরে চলুন। ডানদিকের রাস্তা ধরে গেলে তিস্তা পেরিয়ে জ্যামে ফেঁসে যাবেন। বাঁদিকের দুর্গম অন্ধকার পথে চলতে গিয়ে ওর মনে হল ও এবারে লোকটিকে চিনতে পারছে। কিন্তু……। এমনটা হয়তো হওয়ার কথা নয়। অথচ……।
(২)
ঘন পার্বত্য অরণ্যের পথ চিরে কিছুটা এগোনোর পরে হঠাৎ করে জঙ্গল অদৃশ্য হয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় ওরা এসে পড়ল। হালকা আলোয় কিছু বাড়ি-ঘর চোখে পড়ল।
-চলুন, নেমে পড়ি। লোকটি বললে, -আমরা এসে গেছি।
-কোথায়?
-আরে, চলুন না।
গাড়ি থেকে নেমে ওরা দু’জনে কিছুটা এগিয়ে গেল। কাঠ-বাঁশের কিছু চেয়ার বানিয়ে বেশ একটা বসার জায়গামতন করা হয়েছে। কয়েকজন সেখানে দাঁড়িয়ে গল্প-গুজব করছে।
-আপনি এগোন। লোকটি বলল, -আমি এখানেই অপেক্ষা করে আছি।
ও ক্ষুদ্র জটলাটার দিকে এগিয়ে গেল। আরে চেনা চেনা মনে হচ্ছে লোকগুলিকে। আরেকটু এগিয়ে গেল ও। ঠিক……। চেনাই যায় ওদের। ওরই স্কুল জীবনের জনাকয়েক বন্ধু। একসঙ্গে সব আড্ডা দিচ্ছে। তবে তারা এখন বেশ তালেবর ব্যক্তি। ওর মতন জীবিকার সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো একপ্রকার ভবঘুরে নয়। জীবনের অনেকটা সময় কত সুখ-দুঃখ একসঙ্গে কেটেছে ওদের সঙ্গে। অনেক আড্ডা হয়েছে, অনেক বিড়ি সিগারেট পুড়েছে। ও তাড়াতাড়ি আগ্রহভরে ওদের দিকে এগিয়ে গেল।
-এই দীপেন! কিরে তোরা এখানে? ও কাছাকাছি গিয়ে প্রায় চেঁচিয়েই উঠল।
দীপেন ওর দিকে ফিরে ওকে ভালো করে দেখে নিয়ে বেশ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, -কে রে, জগা নাকি? এখানে?
বাকিরাও ওর দিকে এগিয়ে এল। পাখি আর নাটা’র হাতে সিগারেট। তোতা’র ডান হাতে একটা গ্লাস, বাঁহাতে একটা সিগারেট ধরা। ওদের থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিলে মন্দ হত না। ওর সিগারেট বের করতেই পারে, কিন্তু এদের মতন কোয়ালিটির নয়। সঙ্কোচে ও না পারল চাইতে না পারল নিজের সিগারেট বের করতে। এমনটা কি আগে কোনদিন হয়েছে? অন্তত অতীতের সেইসব সোনালী দিনগুলিতে?
-কী খবর তোর? ওর দিকে ফিরে ওকে মাপতে মাপতে দীপেন জানতে চাইল। বাকিরাও ওকে এখানে দেখে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল। পাখি বলল,
-কী করছিস এখন?
-একটা কাজে কালিম্পং এসেছিলাম, এখন ফিরছি। যেটা ও বলল না, সেটা হল একটা ট্রিপ খাটতে ও এসেছিল। ভালই মালকড়ি পাওয়া যাবে বলে এই লম্বা ট্রিপে ও রাজি হয়েছিল। কিন্তু সেটা কী বলা ঠিক হবে? অন্তত ওদের পোশাক-আশাক দেখে ও এখন কিছুটা মিইয়েই গেল।
-ভালো। নাটা প্রায় ওর মুখেই সিগারেটের একটা রিং ছেড়ে বলল, -থাকিস কোথায় এখন?
-ডালখোলা। তারপরে সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল, -তোরা সব কোথায় আছিস?
-I am now settled in Hyderabad. নাটা আরেক রাউণ্ড সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, -দীপেন এখন দিল্লীতে, পাখি ভুবনেশ্বরে। আর তোতা তো কলেজ পাশ করেই ব্যাঙ্গালোরে।
-জানতাম না। অস্ফুটস্বরে ও বলল।
-জানবি কী করে? তোতা এতক্ষণে ভারিক্কি গলায় বলল, -আমরা সব ফেসবুকে যোগাযোগ করে এখানে এসেছি। আর সেরকম কাউকে পেলাম না।
-কতক্ষণ আছিস তোরা এখানে?
-আজ রাতটা এখানেই থাকব। দীপেন বলল, -কাল আমাদের বাগডোগরা থেকে ফ্লাইট আছে।
-ঠিক আছে। ও বলল, -নে তোরা গল্প কর। আমি আসি এখন।
-যা তাহলে। তোতা বলল, -পরে আবার দেখা হবে।
(৩)
প্রায় পালিয়েই চলে এসেছিল ও। আর বেশিক্ষণ ওখানে থাকা যেত না। কিছুটা এগোতেই দেখল সেই লোকটি দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখে নিজের দিকে আসতে ইশারা করে বলল,
-আমি আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছি।
-কেন?
-এই গল্প করব বলে। লোকটি বলল, -অনেকদিন কারুর সাথে বসে জমিয়ে গল্প করা হয়ে ওঠেনি।
গল্প করার জন্যে আমাকেই বেছে নিলেন? মনে মনে অভিশাপ দিয়ে ও বলল, -চলুন ওখানে বসা যাক।
-দাঁড়ান! লোকটি প্রায় হুকুমের স্বরে বলল, -একটু ঘুরে আসি।
-কোথায়?
-আরে, আসুন না। প্রায় এসেই গেছি।
লোকটি হাঁটতে হাঁটতে ওকে একটি ছোট টিনের ছাউনি ও চাঁচের বেড়া দেওয়া বাড়ির কাছে নিয়ে এল। জায়গাটিকে ওর এখন বেশ চেনা চেনা মনে হচ্ছে। ওর অনেকদিনের পরিচিত, কিন্তু……। সম্পর্কটা যেখানে টাকা-পয়সার এবং যে লেনদেন ব্যাংক মাধ্যমেই হয়ে যায়, তার জন্যে ফালতু ফালতু যাওয়ার কোন প্রয়োজন আছে? ও বাড়ির আঙিনা থেকেই ফিরে যাবে বলে ভেবে রেখেছিল। তবুও……। কিসের টানে যেন…।
-তুমি? জবা বিরক্তিমাখা দৃষ্টিতে ওর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, -হঠাৎ?
-এমনি। কোনমতে ও বলতে পারল। এদিকে এসেছিলাম…।
-কিছু একটা নিশ্চয়ই মনে করে। জবা চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানোর পরে সেটা দিয়েই সিঁথিতে সিঁদুর দিতে দিতে বলল, -এমনি এমনিই চলে এলে? কিছু একটা ভেবে নিশ্চয়ই এসেছ।
-একজনের সঙ্গে এলাম। ও সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করল, -এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম।
-তাহলে সেদিকেই যাও।
-ববিন কোথায়?
-তুমি অত জেনে কী করবে?
স্টেপ আউট করে ছয় মারার মতন ও নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে কর্তৃত্ব জাহির করার সহসা প্রবল ইচ্ছেয় বলে উঠল,
-আমার ছেলে আমি জানতে চাইব না?
-তাহলে সেরকম রোজগার করতে হয়। জবা পালটা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, -ওই দু’টো টাকা পাঠিয়ে হাত ধুয়ে ফেললেই হয় না।
-তুমি কিন্তু উত্তর দিলে না।
-সে পড়তে গেছে। নাও, এবারে খুশী তো?
-তুমি কোথায় চললে?
-তোমার জেনে লাভ? পটিয়ে বিয়ে যখন করেছিলে, তখন কি বলেছিলে যে আমার খরচ আমাকেই রোজগার করতে হবে?
-শুধু আমার ইনকামে কি একেবারেই হত না?
-হত! ভিখিরির মতন। যাও গিয়ে নিজের বন্ধুদের দেখে এসো। জবা বিরক্তিভরে বলল, -ফুটানি তো সব মারতে বাবার পয়সায়। তখন আমি জানব কী করে?
-তা, এখন কোথায় চললে? কিছুটা কঠিন স্বরেই ও জানতে চাইলে।
-আজ আমার নাইট ডিউটি। ছুরি দিয়ে মাখন কাটার মতন করে উত্তর দিল জবা, -তোমার মুরোদ থাকলে আমাকে এভাবে জীবন কাটাতে হত না।
-ববিন আজ ফিরবে না?
-ও আজ ওর মাসির বাসায় থাকবে। সেসব ব্যবস্থা করাই আছে। তোমার মতন অপদার্থের সঙ্গে ঘর করতে হলে সবকিছুই ভেবে রাখতে হয়। এবারে সরো, আমাকে বেরোতে হবে। দরজায় তালা লাগাতে হবে।
(৪)
এই লোকটির সঙ্গ ভালো না লাগলেও কোথায় যেন একটা টান আছে। ও লোকটিকে কাটাতে পারছে না। অন্তত মন থেকে।
-চলুন না, লোকটি বলল, -আরেকটু ঘুরে আসি। আসলে এই বন এতই বিশাল যে পুরোনো সবার সঙ্গেই আজ দেখা হয়ে যাবে। আমাদের ধারে কাছেই আছে তারা।
-চলুন। ও নিমরাজি হয়ে বলল।
কোনমতেই লোকটির আকর্ষণ কাটানো যাচ্ছে না। ঠিক যেন জীবনানন্দের বোধ কবিতা। একেবারে বাস্তবে এসে হাজির। কিছুটা এগিয়ে একটা বাঁকের মুখে ওকে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটি।
-সামনের ওই বাড়িটা দেখতে পারছেন?
-ওই যে আলো জ্বলছে দোতলার ব্যালকনিতে?
-হ্যাঁ। আপনার আপন পিসিমার বাড়ি। যান, একটু ঘুরে আসুন।
অনেকদিন যাওয়া হয়নি। গেলে একেবারে মন্দ হয় না। এতদিন পরে খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে? কিন্তু ধারে কাছে তাকিয়েও মিষ্টির কোন দোকান দেখতে পেল না ও। পিসিমার ডায়াবেটিস যদিও তবু খালি হাতে যাওয়া কেমন দেখায়।
-অত সঙ্কোচের কোন কারণ নেই। লোকটি ওর মনের কথা আন্দাজ করে নিয়ে বলল, -আপনি তো আপনার পিসির কাছে যাবেন। একবার প্রণামটা সেরেই আসুন।
এগিয়ে গিয়ে বেল বাজাতেই কাজের মেয়ে এসে দরজা খুলে দিয়ে গেল। সামনেই বিশাল ডাইনিং। ছেলে বিদেশে, মেয়ে পুনেতে। পিসিমা-পিসেমশাই ছাড়া সারাক্ষণের কাজের একটি মেয়ে থাকে এখানে। ডাইনিং-এর একটি চেয়ারে পিসিমা বসে কিছু সবজি কাটছিলেন। পিসেমশাই একটা খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ওকে দেখতে পেয়েই পিসিমা প্রফুল্ল গলায় বললেন,
-ওমা! আয়, আয়। এতদিনে তোর মনে পড়ল?
এগিয়ে গিয়ে ও দুজনকে প্রণাম করল। বেশ রান্নার আয়োজন করা হয়েছে দেখে ও অবাক হল। বাড়িতে তো প্রাণী মাত্র তিনজন। তাহলে? ওর পিসিমা ওকে চারিদিকে তাকাতে দেখে মনে হয় ওর মনোভাব আন্দাজ করতে পেরেছিলেন।
-আজকে রাতে তোর দাদা আসছে। সেই স্টুটগার্ট থেকে। সঙ্গে বিদেশি বৌমা।
-বাপস। অস্ফুটস্বরে ও বলে উঠল।
পিসেমশাই খবরের কাগজটা টেবিলের উপরে ভাঁজ করে রেখে বলে উঠলেন,
-দু’জনেই ওদের মতন করে বিয়েটা সেরেছে। এবারে আমাদের এখানে ভারতীয় প্রথায় অনুষ্ঠান হবে। তোর দিদিও জামাইকে নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে ঢুকে যাবে।
-হ্যাঁ। পাশ থেকে পিসিমা বললেন, -একসাথে কাজ করতে করতেই ওদের আলাপ। তা, ভালই করেছে। ওদেশের জীবন কত উন্নত। সেসব কি আর আমাদের মতন?
নাহ। অন্তত ওর মতন তো নয়ই। দিদি-জামাইবাবু দুজনেই আবার সফটওয়্যার ফার্মে আছেন। তা, বেশিক্ষণ আর এখানে থাকা যাবে না। পিসিমা-পিসেমশাইয়ের মুখ থেকে তাঁদের সন্তানদের সম্পর্কে প্রশস্তিমূলক কথাবার্তা শুনতে শুনতে ও পরিষ্কার বুঝতে পারল, ওকে এবারে যেতে হবে। জাস্ট চা-টা খেয়েই……। যদিও ততক্ষণ দেরি না করলেই ভালো হয়। তবে তার চেয়ে বেশি দেরি করা ঠিক হবে না।
(৫)
-এসেছিস বাবা? আয়, আয়। ওর মা দরজা খুলে দিয়ে ঈষৎ অভিমানভরে বললেন, -এত দেরী হল তোর?
-এই কয়েকটা জায়গা থেকে ঘুরে এলাম মা।
-আজ না তোমার জন্মদিন? ওর বাবা কিছুটা ভর্ৎসনা করে বললেন, -তোমার জন্যে আমরা কখন থেকে অপেক্ষা করছি! তোমার মা কত কিছু রান্না করে রেখেছে। এদিকে তুমি আড্ডা দিয়ে-টিয়ে সবে ফিরছ।
-আমি আড্ডা দিতে যাইনি বাবা। ও মৃদুগলায় আহতস্বরে বলল, -আমি শুধু কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করে এলাম।
-তারা কি তোমাকে খেতে দেবে? ওর বাবার রাগ তখনও পড়েনি। উনি বলে চললেন, -এটাকেই আড্ডা বলে। তারপরে রাগত গলায় বললেন, -এখনও তোমার চোখ খুলল না?
-আহা, এমনভাবে বোলো না। ওর মা সামনে এসে বললেন, -বাছা আমার, যা গিয়ে হাত-মুখটা ধুয়ে আয়। দেখেই বুঝেছি অনেকক্ষণ কিছু জোটেনি।
বয়স্ক বাবা-মায়ের পক্ষে যতটা করা সম্ভব, ততটাই তাঁরা করেছেন। বিশেষত ওর মা হাঁটুর ব্যথা নিয়েও উবু হয়ে বসে কাঠের আগুনে এতসব রান্নাবান্না করেছেন দেখে ওর খিদেটা যেন চাগাড় দিয়ে উঠল।
-তোমরা দুজনেই বসে পড়ো। ওর মা বললেন, তোমাদের বেড়ে দিই।
-তুমিও বসে যাও আমাদের সঙ্গে। কতদিন আমরা একসাথে খাই না। ওর বাবা উদাসীন কণ্ঠে বলে চললেন, -জানি না আর কবে এই সুযোগ আসবে। তারপরে ওর মায়ের দিকে ফিরে বললেন, -তুমি কিভাবে জানলে ও ঠিক আজকে আসবে?
-আমি জানতাম আজ খোকা আসবে। ওর মা মুখটা নিচু করে বললেন, -আমি ওর মা। আমি ঠিক জানতাম।
আজ কতদিন পরে ওরা একসঙ্গে খেতে বসেছে। কত, কতদিন পরে। ও জানে এই সময় দ্রুত পেরিয়ে যাবে। এই বাড়ি রাত্রির ব্যবধানে পরিণত হবে জঙ্গলাকীর্ণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত এক আবাসে যার জানালা বলে কিছু নেই। দরজা প্রতিবেশিদের কেউ খুলে নিয়ে চলে গেছে। তাদের হাঁস-মুরগী চরে বেড়ায় ওদের আপাত জংলি উঠোনে। বিষাক্ত সাপেরও অভাব নেই এই তল্লাটে। আর ভিতরের পরিত্যক্ত ঘরগুলি বাদুড়-চামচিকে-ভাম মিলে নোংরা করে নরক বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেই বাস্তবতা ও চায় না। এই রিক্ত-ক্লিষ্ট পৃথিবীতে ওর স্বপ্নের মরীচিকা হয়ে মিলিয়ে যাওয়া ও আর সহ্য করতে পারবে না। সবই তো গেছে, দু-দণ্ড একটু মানসিক শান্তি কি ভিক্ষা করতে পারে না?
(৬)
ওরা দুজনে মিলে অন্ধকার নির্জন পাহাড়ে একটা সমতল মতন জায়গা খুঁজে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ নির্বাক বসে থাকল। গল্প জমাতে গিয়ে ওরা বুঝতে পারল পাশাপাশি বসে যৌথ মৌনতাই তুলনায় বেশি অর্থবহ। ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকার কেটে ঊষার আগমনের আভাস পাওয়া গেল। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা নতুন প্রত্যাশার ক্রমশ জন্ম হচ্ছে অন্ধকারের জঠরে।
-শুনছেন? লোকটি ওকে মৃদু ঠেলা দিয়ে বলল, -এবারে আমাকে যেতে হবে।
-এত তাড়াতাড়ি? ও বলল, -আরেকটু কথা বলা যেত না?
-কই আর কথা বললেন আপনি?
-এই যে পাশাপাশি পথ চললাম, বসলাম। এটাও কি কম?
-বলতে গেলে আমিই যেটুকু কথা বলেছি। আপনাকে নিয়ে অনেক জায়গাতেই গেলাম। লোকটি কিছুটা যেন অভিমানভরা কণ্ঠে বলল, -কিন্তু আপনি খামোকা আমাকে এতক্ষণ এড়িয়ে এড়িয়েই গেলেন। চুপচাপ থাকলেন সারাক্ষণ।
-আর এড়িয়ে যাবো না।
-দরকার নেই। লোকটি বলল। আপনি সামনের ওই রাস্তাটি দিয়ে চলে যান। সকাল হতে বেশি বাকি নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিস্তার হাইডেল প্রোজেক্টের ব্রিজ পেরিয়ে কালিঝোরা পৌঁছে যাবেন।
ওকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লোকটি চলে এল গাড়ির কাছে। ওকে বিদায় জানিয়ে বলল,
-একটাই অনুরোধ।
-কী?
-ঘুমিয়ে হোক বা জেগে, মাঝে মাঝে স্বপ্ন কিন্তু দেখবেন।
———-*****———
utoldhara.com সপরিবার বাঙলির মনের ঠিকানা